বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০০৯

সবারই এখন দেশগঠনে মনোনিবেশ করা উচিত

দেশগঠনের জন্য এখন সবাইকে মনোনিবেশ করা উচিত। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বীরসেনানী এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা এ প্রত্যাশার কথাই ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেলেও আমরা এখনও প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার সুফল এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারিনি। স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি হলেও প্রত্যাশিত অর্জন আমাদের হয়নি। তাই এ দিন আমাদের বুদ্ধিজীবী, দেশপ্রেমিক মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে আসা। আর তরুণ প্রজন্মকে ভাবতে হবে দেশ আমাদের কী দিয়েছে সেটা বড় কথা নয়—আমরা
 দেশকে কী দিয়েছি সেটাই বড় কথা।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে গতকাল দৈনিক আমার দেশকে দেয়া পৃথক প্রতিক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য প্রবীণ জননেতা ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্রের সভাপতি বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীরসেনানী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী বীরোত্তম এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, বিজয় দিবস আমাদের গৌরবের দিন, আনন্দের দিন। এই দিন আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনে এই উপলব্ধি জাগা উচিত যে, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, ঘুষ-দুর্নীতি পরিহার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সাম্প্রদায়িক ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া।
তিনি বলেন, দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে বিজয় দিবসের চ্যালেঞ্জ হবে দেশের সার্বিক উন্নয়নে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সততা, আদর্শ, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ধনী-গরিবের ব্যবধান হ্রাস করা এবং গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখা।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সবসময়ই আমার মনে হতো আমরা যুদ্ধে জয়ী হব। কিন্তু আমরা এখন স্বাধীন হয়েছি এ অর্থে যে আমরা একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। তবে এতে আমাদের প্রকৃত রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসেনি। আমাদের অর্থনীতি, আমাদের রাজনীতি সবকিছুই সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কাজেই প্রকৃত অর্থে আমাদের স্বাধীনতা এসেছে এটা আমরা বলতে পারি না। আর মুক্তির প্রশ্ন যদি তুলি সেটা তো আসেইনি।
তিনি বলেন, আমাদের অগ্রসর হওয়ার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দরকার ছিল। এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমাদের বহুরকমের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যবিত্ত একাংশের মধ্যে চমত্কার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে—তারা বিদেশে গিয়ে কাজ করছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ অগ্রসর হচ্ছে। মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে। কিন্তু সমাজে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন, সেটা আসেনি। অর্থাত্ সামাজিক মূল কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সমাজ আগের চাইতে অনেক বেশি অসুস্থ, বৈষম্যপূর্ণ এবং বিচ্ছিন্নতাকে উত্সাহকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা রাষ্ট্র পরিবর্তন করেছি। এটা করেছি মুক্তির লক্ষ্যে সমাজকে বদলানোর জন্য। কারণ মুক্তির সঙ্গে সমাজের পরিবর্তন যুক্ত। রাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে সমাজ বদলানো যাবে না। সমাজকে বদলাতে হলে রাষ্ট্রকেও বদলাতে হবে। এক্ষেত্রে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের বৈষম্য কমবে এবং মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে, স্থানীয় সরকার স্বাধীনভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে, তারাই নিজেদের উন্নয়নে পরিকল্পনা ও অর্থসংগ্রহ করবে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মাতৃভাষার চর্চা হবে এবং তার মধ্যে আন্তর্জাতিকতাও থাকবে। এই মাতৃভাষার চর্চা আমাদের সঙ্কীর্ণ করবে না। এর মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিকতাকে ধারণ করব—সারাবিশ্বে যত অর্জন আছে, যত গৌরব আছে, যত কৃতী আছে সবগুলোর অংশীদার হব। তবে বিশ্বায়ন যাকে বলে তার অধীনে আমরা চলে যাব না। কিন্তু তা আমরা এখনও করতে পারিনি।
তিনি বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের পর পাকিস্তানি আমলের মতো বাংলাদেশের মধ্যেও আবার বৈষম্য রয়ে গেল। ওখানে ছিল জাতিগত বৈষম্য আর বাংলাদেশে শ্রেণীগত বৈষম্য প্রধান হয়ে দাঁড়াল। এই বৈষম্যের কারণে অল্পকিছু লোক ধনী হলো আর বেশিরভাগ লোক বঞ্চিত হলো। কিন্তু সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ছিল তারা মুক্ত হবে এবং মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ছিল তারা আরও সুযোগ-সুবিধা পাবে। এই দুটো স্বপ্ন এক হয়েছিল এবং একটি সমষ্টিগত স্বপ্নে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর মুহূর্তেই এই স্বপ্ন আলাদা হয়ে গেল। মধ্যবিত্ত ধনী হওয়ার ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু করল। অন্যদিকে গরিব মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে, বিপন্ন হয়েছে তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। অর্থাত্ বৈষম্য দূর হলো না। আমরা আশা করেছিলাম, বৈষম্য দূর হবে এবং সমাজে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে। এটা ব্রিটিশ আমলে আন্দোলনের সময় আশা ছিল, পাকিস্তান আন্দোলনের সময় আশা ছিল এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে মুক্তি সংগ্রামের মধ্যেও এ প্রত্যাশা ছিল। একটি নতুন সমাজ গড়ে ওঠার যে স্বপ্ন ছিল তা বাংলাদেশে গড়ে উঠল না। পুরনো সমাজই রইল আর অবাধ সুযোগ পেয়ে গেল মধ্যবিত্ত।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যায়নি। এটা একটা স্তর ছিল। এটাকে মুক্তির দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সর্বোপরি সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার ছিল সেটা আমরা করতে পারিনি। যারা ১৬ ডিসেম্বরের পরে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত, এই রাজনৈতিক শক্তি আমরা পাইনি। এই রাজনৈতিক উপাদানগুলো দেশের মধ্যে আছে। মানুষের মধ্যে বিক্ষোভ আছে, দেশপ্রেম আছে, আগ্রহ আছে এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিক চেতনা আছে। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ করার জন্য রাজনৈতিক শক্তি বিকশিত হয়নি। দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য এখানেই কর্তব্য হচ্ছে দেশপ্রেমিক এবং গণতান্ত্রিক মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এটা হচ্ছে না বলেই আমাদের গোটা দেশজুড়ে হতাশা দেখা দিচ্ছে।
দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করেছেন মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী। ‘জেট ফোর্সে’র অধীনে কামালপুরসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে। এ অবদানের স্বীকৃতিসরূপ তিনি বীরোত্তম উপাধী লাভ করেন। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে স্বাধীনতাযুদ্ধের এই বীরসেনানী মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী তার ভাবনার কথা জানিয়ে বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা নিজেদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার দিকে পাগলের মতো ছুটেছি। দেশ গঠনের দিকে আমাদের কোনো মনোযোগ নেই। আমাদের এখন দেশ গঠন এবং মানুষের মুক্তির বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, এখন তরুণ প্রজন্মের ভাবা উচিত দেশ আমাদের কী দিয়েছে সেটা বড় কথা নয়—আমরা দেশকে কী দিতে পারলাম সেটাই বড় কথা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন